Club Activities · Life View

জাতীয় শহীদ মিনার আর বইমেলায় আমার প্রথম অভিজ্ঞতা

ছোটবেলায় টিভিতে দেখতাম বিশাল এক শহীদ মিনার। শত শত মানুষ ফুল দিচ্ছে। আমি ভেবেই কুল পেতামনা এত ফুল দিনশেষে রাখে কোথায়। আমাদের স্কুল মাঠের ঐ টুকুন শহীদ মিনারের ফুল সামলাতেই হিমশিম খেত ভাইয়ারা। ওরা যখন পুরানো ফুল ফেলে দিতে যেত তখন নিজের কাছেই খারাপ লাগত।

যা হোক, গত সাত বছর ঢাকায় থেকেও আমি কখনও জাতীয় শহীদ মিনারে ফুল দিতে যাইনি। হ্যা.. বেশ অলস আমি। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলের অনুষ্ঠানে যাও যেতাম, ২০১৫ থেকেতো ছুটির দিন পেলেই বেলা বারটা পর্যন্ত আগে ঘুমিয়ে নিতাম।

আমার ঢাকা জীবনে আরেক না দেখা অভিজ্ঞতা ছিল একুশে বই মেলা। বই নিয়ে ঘাটাঘাটি থাকলেও বই মেলায় যাওয়া হয়নি কখনও। কারণ আমরা ফাঁকিবাজ মানুষ নীলক্ষেত থেকে পাইরেট কপি কম দামে কিনে পড়ি। কিংবা অনলাইনে পিডিএফ খুঁজে নিই। তাছাড়া যে ধরণের এ্যন্টিক বা গবেষণাধর্মী বইয়ের সন্ধানে আমি ঘুরি তার খবর যে বই মেলায় পাব না সেটা জানতাম। তাও প্রতিবছরই ভাবছিলাম যে এবারই যাব.. এবারই যাব।

এ বছর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সুবাদে জাতীয় শহীদ মিনার আর একুশে বই মেলায় যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল আমার। কেন্দ্রের বসন্ত উৎসব উপলক্ষ্যে গোটা মাসেই আমরা সবাই একসাথে কাজ করছিলাম। ২০ তারিখের বিকালে আমাদের কয়েকজনের শাহবাগে ফুল কিনতে যাওয়ার কথা থাকলেও অন্য ব্যস্ততায় কেউই যেতে পারিনা। হারুন ভাই একাই ফুল কিনে আনেন।

পরদিন আমি বের হলাম প্রায় ৫.৩০ এর দিকে। এর থেকেও গভীর রাতে আমি আগেও রাস্তায় বের হয়েছিলাম। তাই তখনও ঠিক অবাক লাগছিল না তেমন কিছুই। বরাবরের মত ভোরের মৃদ্যু আলোয় উপভোগ করছিলাম শান্ত এ শহরটিকে। কেন্দ্রের কাছাকাছি এসে দেখি অথই আর উৎস হাঁটছে বাতাসের গতিতে। ওদের সাথে কেন্দ্রে পৌছে দেখি সবাই প্রায় প্রস্তুত। রেদওয়ানের দাদার চাদর চলে এল আমাদের সবার গায়ে। একটু পরেই সুর্যের আলো ফুটতেই একে একে চলে এল আরও অনেকে। সুমনভাই এবার তাড়া দিল সবাইকে বের হওয়ার জন্য।

এই প্রথম আমি ঢাকার রাস্তায় একুশে ফেব্রুয়ারির ভোরে ফুল হাতে হাঁটছিলাম। আমি আর এহতেশাম ধরে নিয়ে যাচ্ছিলাম কেন্দ্রের আনা ফুল। দুজনের কেউই যেন সহজে ক্লান্ত হয়নি। রামিসা লেট করায় ওকে আনতে রেখে গেলাম রেদওয়ানকে। যাই হোক, সবাই মিলে ফুল নিয়ে পায়ে হেটে শাহবাগ হয়ে চললাম শহীদ মিনারের দিকে। রাস্তায় কেউ কেউ ছবি তুলতে এগিয়ে এসে আমাদের থামিয়ে দিচ্ছিল আমাদের।

এমন অনেকেই আমাদের সাথে ছবি তুলতে আসছিল যাদেরকে আমরা চিনিই না। তবে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতি তাদের যে গভীর শ্রদ্ধাবোধ তাদের মাঝে আছে সেটা তাদের চোখ দেখেই অনুভব করা যাচ্ছিল।

শাহবাগের গোল চত্ত্বর পার হওয়ার একটু আগেই আমাদের সাথে এসে যোগ দেয় রামিসা। ঐদিকে নিশু পৌছে গেছে আগেই। আর আবীর পল্টনের জ্যামে। যাই হোক, একটু এগোতেই ফুলের তোড়ার ভার নামিয়ে দিলেন হারুণ ভাই। ব্যাচের অন্য ছেলেরা ফুল হাতে নিয়ে এগোতে শুরু করল সবাই। এবার আমিও গিয়ে যোগ দিলাম ছেলেদের দুষ্টামিতে। রাহাতের গোলাপি পাঞ্জাবি থেকে ‘পিংকি’ নাম হয়ে যাওয়া আর অথই ও আমার দুষ্টামিতে পুরো দল যখন হাসাহাসি করছি, সুমন ভাই একটু ধমকে গেলেন। তবে কে শুনেছে সে বারণ? একটু পরেই আবার যা তাই।

নীলক্ষেতের মোর ঘুরতেই আস্তে আস্তে মানুষের ভিড় বেড়ে গেল। এবার ভাইয়ারা তাড়া দিতে লাগলেন সবাইকে একসাথে থাকার জন্য। কারণ এত ভিড়ে আলাদা হয়ে গেলে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তবুও আড্ডার নেশায় মাতোয়ারা হয়ে আমরা প্রায়ই পিছনে পরে যাচ্ছিলাম। ধীরে ধীরে অবস্থা বুঝে সচেতন হলাম সবাই। পলাশীর মোড়ে আসতেই বোঝা গেলে গোটা বাংলাদেশের মানুষের ঢল নেমেছে সেখানে। এবার ফুলের তোড়া ছেড়ে দেওয়া হল মেয়েদের হাতে। অথই, রামিসা, রুথবা সহ আরও কয়েকজন মিলে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু একটু পরে ওদের মুখভঙ্গি দেখেই বুঝলাম যে হাতে ব্যাথা করছে। তবুও তারা ছাড়তে নারাজ। তাহলে আর কি করা? অবশেষে আমি গিয়ে তোড়ার নিচের ভার নিলাম আর রুথবা ও অথইকে বললাম ব্যালান্স সামলাতে।

শহীদ মিনারের উদ্দেশ্যে আমরা সবাই
শহীদ মিনারের উদ্দেশ্যে আমরা কেন্দ্রের সবাই

রেদওয়ানকে অন্য পাশ ধরতে পাঠিয়েছিলাম। তবে সে সেখানে খুব বেশি সুবিধা করতে পারেনা। একটু পর পর আমরা এগিয়ে চলছিলাম শহীদ মিনারের দিকে। এবার সবার স্যান্ডেল খুলে কোথায় রাখা যায় সেই চিন্তা মাথায় আসতেই চোখ পরল তন্ময়ের ব্যাগের দিকে। ফলস্রুতিতে সবার স্যান্ডেলের নিরাপত্তা দেওয়ার গুরুভারটা পরল তার কাঁধে। ইতিমধ্যে আমি আর অথই ডিবিসি নিউজের একটা ছোটখাট সাক্ষাৎকার দিয়ে ফেলি (যদিও ‍মুল নিউজে আমাদের দুজনেরটাই বাদ পরেছে)।

যতই আমি শহীদ মিনারের বেদির দিকে এগিয়ে যেতে থাকি, আমার পা যখন বেদির বাঁধানা অংশকে স্পর্শ করে সত্যি বলছি , আমি প্রতিবার শিহরিত হয়েছি। প্রতিবার ভেতর থেকে অন্যরকম এক চেতনা আমায় ছুঁয়ে গেছে। শেষ সময়ে আমাদের সাথে এসে যোগ দেয় আবীর। জানা যায় যে সে টিএসসি ঠিক মত না চেনার দরুণ এমন দেরি হয়েছে। অবশেষে একটু একটু করে এগিয়ে গিয়ে শেষ হল ফুল দেওয়া পর্ব। এরপর সেখান থেকে বেড়িয়ে এসে সবাই এক সাথে হয়ে নতুন গন্তব্যের উদ্দ্যেশ্যে রওনা দিলাম।

সবাই মিলে এবার যাত্রা শুরু করলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের দিকে। সেখানে পৌছতেই বোঝা গেল পেটের ছুচো গুলো উইনসাইন বোল্টের চেয়েও দ্রুত দৌড়াতে পারে। বড়রা সেটা বুঝতে পেরেই হয়তো আমাদের আগে খাওয়ার সুযোগ করে দেন। তবে বরবরের মত খাওয়ার টেবিলেও আমাদের দুষ্টামি আর আড্ডা চলতে থাকে সমান তালে। শেষমেশ যখন রামিসা আর রুথবা খাবার শেষ করতে পারেনা, তখন ওদের সাহায্য করতেই এগিয়ে যায় দলের বাচ্চাছেলেটি।

খাওয়া শেষে একটু ছবি তোলা শেষ করেই সবাই মিলে এগিয়ে যাই কার্জন হলের দিকে। সেখানে বসেই একটু বিশ্রামের সিদ্ধান্ত হল। কার্জন হল থেকেই বিদায় নিলেন সুমন ভাই। তারা সেদিন মানিকগঞ্জে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আরেকটি স্কুলের বাচ্চাদের সাথে সময় কাটাতে চলে গেলেন।

আলোকবর্তিকা ব্যাচের মেয়েদের দৌড় প্রতিযোগিতা
আলোকবর্তিকা ব্যাচের মেয়েদের দৌড় প্রতিযোগিতা

তার পরেই শুরু হল খেলাধুলা পর্ব। ছেলেদের মোরগ লড়াই দিয়ে শুরু হয় এ পর্ব। এরপর মেয়েদের দৌড়। সে এক ঐত্যিহাসিক ব্যাপার-স্যাপার।

এবার আবার সবাই একটু জিরিয়ে হাঁটা শুরু করলাম বই মেলার দিকে। পথে দোয়েল চত্বরে একটু ছবি তোলা। মেলায় ঢুকেই সবাই ছুটে চললাম বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের স্টলের দিকে। আমি এবারই প্রথম এসেছিলাম বই মেলায়। তাই চারদিকের নতুন বইয়ের ঘ্রাণ আর তাদের বাহারি প্রচ্ছদের রঙের মিলমিশে আমি আবিষ্কার করি এক নতুন জগৎ। যাই হোক, সব বিস্ময় এক মনেই হজম করলাম আমি। স্টলে ঘোরাঘুরি, সবাই মিলে আড্ডা দেওয়া,

দোয়েল চত্বরের সামনে আমরা কেন্দ্রের সবাই
দোয়েল চত্বরের সামনে আমরা কেন্দ্রের সবাই

ভাইদের সাথে ছবি তোলা, এক সাথে কোক খাওয়া – সময় গুলো আজীবনের জন্য স্মৃতির পাতায় রেখে দেওয়ার জন্য অপুর্ব সুন্দর। এরপর হারুণ ভাইকে সাথে নিয়ে আমরা আবার বাসে করে ফেরত আসলাম কেন্দ্রে।

This slideshow requires JavaScript.

কেন্দ্রে এসে হারুণ ভাই আমাদের ‘টাটা-বাই বাই’ করতে চাইলে আমরা তখনও পিছন ছাড়তে নারাজ। নূর ভাই বলেছিলেন বসন্ত উৎসবের জন্য রিহার্সেল করাবেন। কিন্তু কারও মাঝে কোন শক্তি নাই। তাই রিহার্সেল বাতিল ঘোষণা করা হল। সেই সুযোগে ছাদে গিয়ে আমি, রেদওয়ান, তাহমিদ, রাহাত, রুথবা সহ আরও অনেকে মেতে উঠেছিলাম এক প্রাণবন্ত আড্ডায়। তবে রামিসা এসেই খবর দিল যে নুর ভাই এসেছেন। তাই সেদিনের আড্ডা ভেঙে দিয়ে সবাই চললাম বসন্ত উৎসবের রিহার্সেলের জন্য। তবে গোটা দিনের নানা স্মৃতি থাকবে মস্তিষ্কের গভীরে আজীবন।

বই মেলায় কেন্দ্রের স্টলের সামনে আমরা সবাই
বই মেলায় কেন্দ্রের স্টলের সামনে আমরা সবাই

সে যাই হোক, সব মিলিয়ে অসাধারণ সুন্দর একটি দিন কেটেছিল আমাদের। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র পরিবারকে অসংখ্য ধন্যবাদ আমাদেরকে এত সুন্দর একটি দিন উপহার দেওয়ার জন্য। প্রতিটা মুহুর্ত এত সুন্দর ছিল যে আমি নিজেও মাঝে মাঝে লিখতে গিয়ে থমকে যাচ্ছিলাম যে কি কি লিখলাম আর কি কি লেখা বাকি থাকল। তবে সব কথা না হয় নাই লেখা থাকল এখানে। কিছু স্মৃতি ভেসে থাক ভালবাসা আর শ্রদ্ধার স্পর্শে।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আমাদের বসন্ত উৎসব সম্পর্কে পড়ুন এখানে

ছবি গুলি তুলেছেন: অশ্চুতা নন্দ শাওন

Advertisements

One thought on “জাতীয় শহীদ মিনার আর বইমেলায় আমার প্রথম অভিজ্ঞতা

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s