General Writings · Life View

প্রাইমারি স্কুল: গণিত শিক্ষক ফরিদ স্যার

 

আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে হঠাৎ করেই যেন প্রাইমারি স্কুলের দিনগুলির কথা মনে পরে গেল। বিছানার পাশে জানালা থাকার ফলে ঘুম ভেঙলেই আকাশ দেখি। তবে সেই ছোট্টবেলার স্কুল জীবনটায় এমন আধো মেঘের আকাশের নিচে আমি সাইকেল নিয়ে প্রায় উড়েই চলতাম। ফলে বেশিরভাগ দিন আব্বুর বড় চাচার গিফট করা সাইকেলটাতে ছোট-খাট সমস্যাতো হয়েই যেত।

স্কুল জীবনের প্রথম পাওয়া সেরা শিক্ষকটা ছিল ফরিদ স্যার। ক্লাস ফোর পর্যন্ত বড় আপার সুবাদে প্রাইভেট টিউটরের কাছে দৌড়াতে হয়নি। তবে ক্লাস ফোর মানে ২০০৯ ছিল একটু বেশি বদমাইশির বছর আরকি। ক্লাস ফোর আর ক্লাস ফাইভের পাশাপাশি ক্লাস হতো। আমাদের ক্লাসের মাঝে ছিল শুধু একটা উঁচু দেওয়াল। দেওয়ালের উপর দিয়ে অনায়াসে কয়েকটা মানুষ পাচার করা যেত। ফলে যখনই স্যার আসতে দেরি করতো, তখন কাগজের টুকরা ছোড়া, জোড়ে গান গাওয়া আর আমার মত লম্বু (ক্লাসে ৫/৬ জন ছিলাম এই ক্যাটাগড়িতে) ভাল ছেলেরা লাফিয়ে লাফিয়ে বাদরামি করতো। তবে ফরিদ স্যারকে দুই ক্লাসের সবাই যমের মত ভয় পেত। স্যার আমাদের গণিত করাতেন। তাকে আসলেও পড়াশোনার জন্য কখনো বেশি রাগতে দেখিনি। তবে ক্লাস কিংবা ক্লাসের বাইরে একটু বাদরামি করলেই হাজির থাকতেন স্যার।

ক্ল্যাস ফোর থেকে সাধারণ অংকের পাশাপাশি ১০ টা এক কথায় উত্তর টাইপ প্রশ্নের উত্তর করতে হতো আমাদের। প্রক্রিয়া চিহ্ন, সংখ্যা প্রতীক, সংখ্যা পদ্ধতি কাকে বলে – এ ধরণের প্রশ্ন আর কি। ফরিদ স্যার প্রতি ক্লাসে ২০/২৫ টা করে এরকম প্রশ্ন বোর্ডে করাতেন। ফলে কেউ ক্লাস মিস দিলেই আর সিরিয়াল অনুসারে সব প্রশ্ন পাবেনা। আমি তখন খুবই ভাল ছেলে। স্কুলে যাই নিয়মিত। কারণ ওটাই একমাত্র সুযোগ বাসার বাইরে সব রকম বাদরামি কর্মকান্ড চালানোর। তাই আমার নোটে প্রায় ১০০ টার মত প্রশ্ন সিরিয়াল অনুসারে সাজানো ছিল। ফলে এই নোট তখন বিশেষ মুল্যবান বটে।

প্রথম সাময়ীক পরীক্ষার কয়েক সপ্তাহ আগে ক্লাসের সবাই নোট মেলানো শুরু করলো যে সব প্রশ্ন আছে নাকি। দেখা গেল আমার খাতা ছাড়া কারও কাছে সব গুলো নাই। ফরিদ স্যার ক্লাসে এসে নোটের প্রশ্নের কথা জানতে চাইলে সবাই চুপ। আমি খাতা নিয়ে গিয়ে স্যারকে দিয়ে সব চেক করিয়ে আনলাম ঠিক আছে কিনা। পরদিন ক্লাসে সবাই স্যারকে আবার নোটের জন্য বললে স্যার আমাকে দেখিয়ে দেন। সবাইকে বলে দেন আমার খাতা ফটোকপি করে নিতে। আমি বেচারা স্যারের ভয়ে কিছুই বলতে পারিনি যে আমার মিলিয়ন ডলারের নোট দেওয়া যাবে না।

এরপর বন্ধুরা যখন নোটের জন্য আসতে লাগলো আমি তখন একেক দিন একেক বাহানা দেই। কখনো বলি আপু আজ বাসায় পরীক্ষা নিবে, তাই নোট দেখে পড়ব। আবার একেক দিন বলি যে, খাতা আনি নাই, খাতাটা খুঁজে পাচ্ছিনা। এভাবে কয়েকদিন পর স্যারের কাছে সবাই যায়ে আবার বললো যে আমি ওদেরকে নোট দিই না। স্যার খালি ক্লাসে এসে আমায় বলেছিল, ‘নোট দিলে বুদ্ধি কমে না। বই, গাইড সবার কাছেই থাকে। কিন্তু সবাই সব পারে না। ’ স্যার সবাইকে আবারও বলে গেলেন আমার খাতা ফটোকপি করে নেওয়ার জন্য।

সেদিন স্যার যেটা বলেছিলেন, তার গভীর অর্থটা বুঝেছি আরও পরে। একই কথাটা ২০১৪ সালের ড. কুদরত-ই-খুদা ক্যাম্পে ইব্রাহিম ভাই বলেছিলেন, ‘নলেজ ইজ পাওয়ার- পুরানো কথা। শেয়ারিং নলেজ ইজ পাওয়ার- এটাই সত্য।’ ফরিদ স্যারের সেই ২০০৯ সালের কথা কে জানতো আমার মত বদমাইশকে আরও ধান্দাবাজ বানাবে।

ক্লাসের এতগুলি বন্ধুদের কাছে খাতা গেলে, খাতা কবে নাগাদ অক্ষত ফেরত পাব সেটা বলা মুশকিল। আদৌ পাব কিনা তাও বলা যায় না। তাই এবার নতুন প্ল্যান। ১০০ টা প্রশ্ন ২ কলাম করে অফসেট কাগজে লিখলাম। এবার সেগুলিকে ফটোকপি করা। তারপর মাথায় কিসের থেকে কি হয়ে গেল আল্লাহ জানে। প্রতি সেট নোটে ফটোকপির খরচ থেকে ৫ টাকা বাড়িয়ে নিলাম। ক্লাসের কেউ নোট খাতা চাইতে আসলে, ঐ ফটোকপি করা নোট ধরিয়ে দিয়ে টাকা নিতাম। সবাই মোটামুটি খুশি। কারণ খাতা দোকানে নিয়ে গিয়ে ফটোকপি করা কিছুটা ঝামেলা। আর খাতা নেওয়া, ফেরত দেওয়াটাও সময় সাপেক্ষ।

ফরিদ স্যার হঠাৎ একদিন নোটটার এই অবস্থা দেখলেন। আমার ধান্দা বুঝতে পেরেছিলেন কিনা মনে নাই, তবে স্যার কিছুই বলেনি। এরই মাঝে বানিজ্যে আরেক ব্যাঘাত। ক্লাসের কে যেন আরেক বন্ধুর কাছ থেকে ফটোকপি নিয়ে গিয়ে সেটার ফটোকপি করেছে। এবং আমার দামের চেয়ে তার কম টাকা লেগেছে। আমিতো পরলাম আরেক বিপদে। কিভাবে সামাল দিব? পরে দেখি ফটোকপি থেকে কপি করা নোটের প্রিন্টের মান খারাপ। স্বাভাবিক ভাবেই এরকম হওয়ার কথা। আর কপি হওয়ার সময় অনেক অংশ আসেনি। তবে আমি সবাইকে বোঝালাম যে আমার নোট আসল আর ভাল কপি। তাই দাম একটু বেশি।

এই গণিতের নোটের বানিজ্যটা বেশ গুছিয়েই করেছিলাম। আব্বুর হিসাবের খাতা আর আমার সেজ বোনের হিসাববিজ্ঞান খাতার দাগটানা শেপ দেখে আমিও বানাই, নোট বিক্রয় খাতা। সেখানে যে নোট নিচ্ছে তার নাম আর রোল লেখা থাকতো। কেউ টাকা কম দিলে (পরে দিয়ে দেওয়ার শর্তে) নামের পাশে লেখা থাকতো। ২০০৯ থেকে ২০১০ এর মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত চলে এই নোট বিক্রয় কর্মকান্ড। তবে ফরিদ স্যারের সেদিনের কথার যে উচ্চ পর্যায়ী অর্থ সেটা মাথায় গাঁথতে সময় লেগেছে বহুকাল।

ক্লাস ফাইভে ওঠার পর হঠাৎ করেই মনে হল খুব সিরিয়াস পড়াশোনা দরকার। ফেব্রুয়ারি মাস নাগাদ বাসায় বললাম গণিতের স্যার লাগবে। ফরিদ স্যারের কাছে পড়ব জানালাম। আপু রাজি হয়ে গেল। স্যারের সাথে কথা বলে ঠিক করে দিল। স্যারের বাসায় গিয়ে স্কুলের পর পড়ে আসতে হবে।

এবার স্কুলের পরেও আরেকটা জীবন ধরা দিল আমার কাছে। প্রতিদিন ১১ টার সময় স্কুল শেষে স্যারের বাসায় যেতাম। স্যারের বাসা ছিল কমলাপুর। স্কুল থেকে কিছুটা দুরে। তাই প্রতিদিনিই নানা গল্প-আডডায় পথ মাতিয়ে যেতাম আমরা। স্যারের বাসায় আগে পৌছে অর্পন, চৈতি, হাসিব আর আমি যে সব ভাল ভাল কাজ করতাম সেগুলি বলা যাবেনা। তবে স্যার বাসায় ঢুকার পর, সবাই আমার থেকেও ভদ্র বাচ্চা। আমাদের সাথে আরও পরে যোগ দেয় চঞ্চল আর শোভন।

গণিতের শিক্ষক হয়েও স্যারকে বিরক্ত করেছি বহুকারণে। সপ্তাহে কোন একদিন প্রাইভেট বাদ গেলে, শুক্রবারে চলে যেতাম। ভদ্রলোক খাওয়া শেষ করে নিরবে আমার পাশে বসে বিজ্ঞানের অভিযোজন কাকে বলে পড়াতেন।  অন্যদিকে তার ৪/৫ বছর বয়সের ছেলে তার মাথায় উঠে আজব আজব খেলাধুলা চালাতো। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা একেক দিন প্রায় ৪/৫ টা ইংরেজি মডেল টেস্ট সলভ করে নিয়ে যেতাম। যেগুলোর উত্তর বইয়ে পেছনে থাকলেও স্যার বিশ্বাস করতের আমি উত্তর দেখে লিখিনি। আর স্যারও কোনদিন বলেননি যে এ্যান্সার শিট মিলায়ে নিও। বাংলাতেও সেই একই অত্যাচার আমি চালাতাম তার সাথে। স্যারকে আমি নিরবে সব সহ্য করতে দেখেছি। আমি হলেতো স্টুডেন্টকে খুব খাতির করতাম।

ফরিদ স্যারের থেকে আমি গণিত শিখেছি। এটা বলতে এখন লজ্জা লাগে। কারণ স্যার যেভাবে আমাকে তখন গড়েছিলেন, তার কিছুই নাই। আমি নিশ্চিত আজ যদি আবারও আমি বই খাতা নিয়ে তার সামনে ক্লাস ফাইভের সেই গণিতও করতে বসি, আমার হাতে বেতের দাগ পরবে। স্যারের শেখানো সেই ঐকিক নিয়ম – বাড়লে গুণ, আর কমলে ভাগ হবে.. তারপর যত রকম হিসাবই হোক ১ দিয়ে ঐকিক নিয়মে নিতে হবে… তখনকার ১১তম অধ্যায়ে সুদ-মুনাফার অংকগুলি আজও কয়েকটা মাথায় গেথে আছে। আমার স্পষ্ট মনে আছে, এপ্রিল মাস নাগাদ আমার অংক বই কয়েকবার শেষ করিয়েছিলেন তিনি। আর সেটা শুধুমাত্র এখনকার স্যারদের শেষ করানো না। আমি আসলেও বইয়ের যে কোন অংক পারতাম।

পিএসসি বিদায় অনুষ্ঠান- সূর্যমুখী শিশু বিদ্যালয়,২০১০
পিএসসি বিদায় অনুষ্ঠান- সূর্যমুখী শিশু বিদ্যালয়,২০১০

বরাবরের মত, আমি ভদ্র বাঙালি। স্যার এভাবে কোর্স শেষ করে দেওয়ার পর বাসায় জানালাম যে আর গণিতের প্রাইভেট লাগবেনা। এখন তাহলে ইংরেজী পড়া যাক। কারণ গণিতের শিক্ষকতো আর ইংরেজী জানেনা। সেদিন কি অবুঝ ছিলাম আমি। আজ নিজেই নিজের বোকামিকে ভেবে হাসি। যাই হোক, স্যারকে জানাতে গেলাম যে আজ থেকে আর আসবো না। স্যার শুধু বললেন, ‘আচ্ছা। সমস্যা নাই। মন দিয়ে লেখাপড়া করিস। ’

ব্যাস। এরপর আর সেভাবে তার দিকে তাকানোর ফুরসত ছিল না। বাকি বছরে আরও একজন স্যারের কাছে গণিত করতে গিয়েও বুঝেঝি যে ফরিদ স্যার আসলে আমাকে সব বুঝিয়েই দিয়েছেন। তবে প্রাইভেট পড়া না পড়া নিয়ে স্যার কোন দিন কিছু বলেননি। এমনকি তখনও তিনি আগের মতই ক্লাসে আমার সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন সাবলীলভাবে।

পঞ্চম শ্রেণির টেস্ট পরীক্ষার ফলাফল বের হল। গণিতে বেশ ভালই করেছিলাম। তবে কিছু ছোট-খাট ভুল ছিলই। মফস্বল এলাকার স্কুল ছিল। তাই স্টুডেন্ট স্কুলে না আসলে খোঁজ নেওয়ার তেমন চল ছিলনা। তবে টেস্টের রেজাল্ট আনতে গিয়ে নিজেদের খাতার মাঝে লাল কালির চিত্রকর্ম দেখে সবাই হতভম্ব হয়েছিলাম। ফরিদ স্যার সেদিনও সব রকম সমস্যা নিয়ে কথা বলেছিলেন। আর বরাবরের মতই তার হাতে ছিল হেড স্যারের লাল বেত।

পিএসসি পরীক্ষার ফলাফলের আগেই ঢাকায় এসে পরি আমি। পুরো সেন্টারে আমি আর মুন গণিতে ১০০ তে ১০০ ই পেয়েছিলাম। ও আমার  পিছেই ছিল অবশ্য। কে কার টা দেখেছি বলা মুশকিল। টেলেন্টপুলে বৃত্তিও পেলাম। ঢাকা চলে আসার কারণে স্কুলের কোন শিক্ষককেই আর রেজাল্ট উপলক্ষে পা ছুঁয়ে সালাম করার সৌভাগ্য হয়ে ওঠেনি আমার।

ষষ্ঠ শ্রেণির অনেক গণিতেও আমি ফরিদ স্যারের লজিক গুলো খাটাতাম। সব সময় কাজে না দিলেও বেশির ভাগ সময়ই মিলে যেত। বড় ছুটিতে কুষ্টিয়া গেলেও ফরিদ স্যারের মুখোমুখি হয়ে উঠতে পারিনি। রাস্তায় হঠাৎ সাইকেলের উপর দেখা হলে সালাম দিলে স্যার সেই আগের মতই ঘাড় নেড়ে চোখ বুজে উত্তর দিতেন। ওনার সাথে আমার শেষ দেখা হয় বাসার কাছের এক ক্লিনিকে। আমি ছুটিতে বাড়িতে ছিলাম। ওনার স্ত্রীর ডেলিভারি ছিল আর কি। স্যারের মেয়ে হয়েছিল সেবার। আমাকে দেখে স্যার খালি একটু মুচকি হেসেছিলেন।

প্রতি বছর ডিসেম্বরের স্কুল ছুটিতে বাড়ি গেলেও ২০১৪ তে যাওয়া হয়ে ওঠেনা। আজ যাব, কাল যাব করতে করতে ছুটি ফুরায়। ২০১৫ এর এপ্রিল মাসের দিকে বাড়িতে গিয়ে শুনি স্যার আর নেই। ডিসেম্বর মাস নাগাদ ব্রেইন স্ট্রোক করে মারা গেছেন। বিষয়টা বেশ স্বাভাবিক আমি জানি। কিন্তু সেই সময়টা হঠাৎ করেই প্রচন্ড খারাপ লেগেছিল। স্যারকে কোনদিন পা ছুঁয়ে সালাম করা হয়নি। কোন দিন তাকে বলে ওঠা হয়নি যে তার বেতের আঘাত গুলো আজও মিস করি। হয়তো স্যারকে আর কোন দিন বলেও ওঠা হবেনা, ‘স্যার, নোট গুলি কি ঠিক আছে?’

 

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s