Uncategorized

‘সাধারণ তাত্ত্বিক বিষয়াবলিতে বাঙালি তরুণদের অসামান্য মেধা রয়েছে’ – মুহম্মদ জহিরুল আলম সিদ্দিকী, সিনিয়র লেকচারার ও প্রধান গবেষক, গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয়

মুহম্মদ জহিরুল আলম সিদ্দিকী সিলেটের রেবতী রমন হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন। এমসি কলেজ থেকে এইচএসি। তারপর শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়ন বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষে ২০০৩ সালে পিএইচডি করতে পাড়ি জমান সাউথ কোরিয়ার পুশান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে। পিএইচডি শেষে পোস্ট ডক্টরাল গবেষক হিসেবে কাজ করেন অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ে। এরপর ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ডে রিসার্চ ফেলো হিসেবে ছয় বছর কাজ করার পর ২০১৫ সাল থেকে গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষক হিসেবে কর্মরত। ক্যানসার শনাক্ত করতে সক্ষম সহজলভ্য ডায়াগনস্টিক ডিভাইস উদ্ভাবন করে সারা বিশ্বে সাড়া ফেলে দিয়েছেন মুহম্মদ জহিরুল আলম সিদ্দিকী। সম্প্রতি তিনি দেশে এসেছিলেন একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশ নিতে। সেমিনারের ফাঁকে বিজ্ঞানচিন্তার জন্য দিয়েছেন একটি সংক্ষিপ্ত সাক্ষত্কার। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন আলিমুজ্জামান

বিজ্ঞানচিন্তা: আপনার গবেষণার বিষয়বস্তু সম্পর্কে জানতে চাই।
মুহম্মদ জহিরুল আলম সিদ্দিকী: আমরা মূলত ক্যানসার, ট্রপিক্যাল রোগসহ বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধি নিয়ে গবেষণা করছি। এসব রোগ নির্ণয়ের জন্য যেসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়, সেগুলো বেশ ব্যয়বহুল। স্বল্প খরচে ক্যানসার ও সংক্রামক ব্যাধি নির্ণয়ের নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের লক্ষ্যে গবেষণা করছি আমরা। আমাদের মূল লক্ষ্য নতুন নতুন প্রযুক্তি সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনা। ২০১২ সাল থেকেই আমরা এ বিষয়ে কাজ করছি। ইতিমধ্যে আমরা ছোট একটি যন্ত্রের সাহায্যে ক্যানসার নির্ণয় করতে সক্ষম এমন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছি। এটা সফল হলে ঘরে বসেই রোগীরা ক্যানসার শনাক্ত করতে পারবে। এই যন্ত্রটিতে আমরা বেশ কিছু মেটালিক-ম্যাগনেটিক ন্যানো পার্টিকেল ব্যবহার করেছি। সেগুলোর সঙ্গে ক্যানসার শনাক্ত করতে সক্ষম বায়োমার্কার সংযুক্ত করা হয়। বায়োমার্কারের উপাদানগুলো নির্ধারিত জৈব উপাদানের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারে। এরপর এই উপাদানকে যে রক্ত, লালা কিংবা মূত্রের সঙ্গে মেশানো হয়, রোগীর শরীরে যদি ক্যানসারের কোষ থাকে, তাহলে সেগুলো বায়োমার্কারের উপাদানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। এরপর ম্যাগনেটিক প্রভাব ব্যবহার করে রক্তের বাকি উপাদানগুলো থেকে এই পার্টিকেলগুলো আলাদা করে ফেলা হয়। এই পর্যায়ে কিছু অতিরিক্ত নির্দেশক ফ্লুইড ব্যবহার করলেই উপাদানের রং বদলে যাবে। এটা থেকে অনায়াসেই ক্যানসারের কোষ ওই রক্তে আছে কি না বোঝা যাবে। এ ছাড়া রঙের মাত্রার ওপর নির্ভর করে ক্যানসারের ধাপ সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া সম্ভব।

বিজ্ঞানচিন্তা: ভবিষ্যতে আপনাদের এই উদ্ভাবন বাংলাদেশের জন্য কীভাবে ফলপ্রসূ হতে পারে?মুহম্মদ জহিরুল আলম সিদ্দিকী: আশা করি, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশেও এই প্রযুক্তি সহজলভ্য হয়ে উঠবে। এটি বাণিজ্যিকভাবে উত্পাদন করা হলে সর্বোচ্চ খরচ পড়বে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। তবে এটা এখনো পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে। আমরা আরও উন্নত করে আরও কম খরচে এই সেবা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চাই। এ ছাড়া এখনো গোটা পরীক্ষায় যেসব টেকনিক্যাল কাজ করতে হচ্ছে, সেগুলো আরও সহজ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাই এটা এখন শুধুই কিছু সময়ের অপেক্ষা। অচিরেই এই উদ্ভাবন বাংলাদেশে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে।

Shiddiky-5

বিজ্ঞানচিন্তা: প্রযুক্তির উত্কর্ষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভবিষ্যতে চিকিত্সাসেবার খাতকে কীভাবে আরও বেশি সমৃদ্ধ করা যাবে?
মুহম্মদ জহিরুল আলম সিদ্দিকী: চিকিত্সা খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার অবশ্যই প্রশংসনীয়। আগে কোনো নারী সন্তানসম্ভবা কি না, বোঝার জন্য নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন পড়ত। এখন কিন্তু সাধারণ একটি স্ট্রিপ ব্যবহার করেই এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হয়েছে। প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে মানুষের জন্য চিকিত্সাসেবা আরও সহজলভ্য হচ্ছে। এখন যদি ক্যানসার শনাক্ত করার আদিম পদ্ধতি আমরা ব্যবহার করি, তাহলে খরচ পড়বে ৪০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা। সেখানে হয়তো ৫০০ টাকার একটা সামান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে রোগী নিজেই ঘরে বসে ক্যানসার শনাক্ত করতে পারবে। এ ছাড়া গ্লুকোজ পরিমাপ, রক্তের বিভিন্ন উপাদান নির্ণয়েও বিভিন্ন  প্রযুক্তিপণ্য ব্যবহার করা হয়। ব্যক্তিগত স্বার্থের কথা চিন্তা না করে এ ধরনের প্রযুক্তি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো যদি মানুষের সেবার জন্য কাজ করে, তাহলে কিন্তু অচিরেই চিকিত্সা খাতে বিরাট বিপ্লব ঘটানো সম্ভব। সাধারণ মানুষই তাদের নিজেদের চেকআপের জন্য এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে। এতে রোগী নিজে রোগ সম্পর্কে আরও বেশি সচেতন থাকতে পারবে। ফলে প্রাথমিক ধাপে ক্যানসার ধরা পড়বে, তখন সেটা সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব।

বিজ্ঞানচিন্তা: বাংলাদেশের এ ধরনের পোর্টেবল ডায়াগনস্টিক ডিভাইসের ভবিষ্যত্ কী রকম?
মুহম্মদ জহিরুল আলম সিদ্দিকী:আমাদের দেশে বিপুল পরিমাণ জনসংখ্যার তুলনায় চিকিত্সকের সংখ্যা কিন্তু খুবই কম। যেকোনো হাসপাতালে গিয়ে দেখবেন, একজন চিকিত্সকের চেম্বারের বাইরে কয়েক শ মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। ফলে বোঝাই যাচ্ছে যে এত বেশি মানুষকে পরিপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য চিকিত্সকের সংখ্যা নগণ্য। এই পোর্টেবল ডায়াগনস্টিক ডিভাইসগুলো এ ক্ষেত্রে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তা ছাড়া পল্লি অঞ্চলে অভিজ্ঞ চিকিত্সক পাওয়াও দুষ্কর। সে ক্ষেত্রে একটি পোর্টেবল ডায়াগনস্টিক ডিভাইসের মাধ্যমে কিন্তু আধুনিক চিকিত্সাসেবা সহজেই সাধারণ মানুষের মধ্যে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। তারা কম খরচে ও কম সময় ব্যয় করে এ ধরনের আধুনিক চিকিত্সা গ্রহণ করতে পারবে। ডিভাইসটির দাম তুলনামূলকভাবে বেশ কম। হয়তো আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে সারা শরীরের রোগ শনাক্ত করতে পারে এমন পোর্টেবল ডিভাইসও উদ্ভাবন করা হবে। তাই ভবিষ্যতে বড় বড় রোগ শনাক্তকারী পরীক্ষগুলো দামি গবেষণাগারের পরিবর্তে এ রকম সহজলভ্য ডিভাইসে করা সম্ভব হবে।

 

বিজ্ঞানচিন্তা: চিকিত্সা খাতের প্রযুক্তি নিয়ে এ দেশের যেসব তরুণ গবেষণা করতে চান, তাঁদের জন্য কী পরামর্শ দেবেন?

মুহম্মদ জহিরুল আলম সিদ্দিকী: আমাদের নিজের গবেষণাগারে আটজন বাঙালি শিক্ষার্থী আমার সঙ্গে কাজ করে। তাদের দেখে আমি বুঝেছি যে আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা গবেষণার ক্ষেত্রে কাজ করার জন্য খুবই উত্সাহী। তবে সে ক্ষেত্রে তাদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায় ব্যবহারিক জ্ঞান। সাধারণ তাত্ত্বিক বিষয়াবলিতে বাঙালি তরুণদের অসামান্য মেধা রয়েছে। কিন্তু গবেষণাগারে সাধারণ কাজ করার অভিজ্ঞতা না থাকার ফলে তারা হাতে-কলমে কোনো পরীক্ষা সহজে করতে পারে না। কিন্তু কয়েক মাসের চেষ্টায় এই সমস্যাও আমি তাদের কাটিয়ে উঠতে দেখেছি। আর এ জন্য আমি তাদের বলব ঠিকভাবে পড়াশোনা করতে। হাতের কাছের তথ্যপ্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার করতে। আর নিজেদের বইয়ের জ্ঞান ব্যবহার করে বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। এ ছাড়া নিজের গবেষণার বিষয়ে সচেতন হতে হবে। তাহলেই ভবিষ্যতে আরও ভালো কিছু করা সম্ভব।

মুলপ্রকাশ: বিজ্ঞানচিন্তা, মার্চ, ২০১৮

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s